'হুনি রাঁধনত গুণী হন' বৈচিত্র্যময় এক শুঁটকি রান্না প্রতিযোগিতা
আবহমান কাল থেকেই শুঁটকি মাছ বাঙ্গালীর কাছে জনপ্রিয়, সুস্বাদু ও পুষ্টিকর একটি খাবার। আগের দিনে শুঁটকি মাছ বিশ্বব্যাপি এত পরিচিত ছিল না। কিন্তু এখন দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে শুঁটকি মাছ। বাজারে এতো এতো শুঁটকি মাছ পাওয়া গেলেও স্বাস্থ্যকর শুঁটকি মাছ পাওয়া যায় খুবই কম। এসব শুঁটকি মাছ খাওয়ার ফলে হতে পারে লিভার ক্যান্সার, কিডনি ড্যামেজ, খোসপাঁচড়াসহ নানা চর্মরোগ। শুঁটকি মাছ খেলে ক্যান্সার হয় এই ভয় আর নয়। শুঁটকি রান্নায় নতুনত্ব আনা, দেশসেরা গুণী রাঁধুনিদের খুঁজে বের করা এবং কেমিক্যাল মুক্ত শতভাগ নিরাপদ শুঁটকি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য কে সবার কাছে তুলে ধরার লক্ষ্যে আয়োজন করা হয় দেশের একমাত্র শুঁটকি রান্না প্রতিযোগিতা 'হুনি রাঁধনত গুণী হন'।
২০২১ সালে চট্টগ্রামে আয়োজন করা হয় শুঁটকি রান্না প্রতিযোগিতা 'হুনি রাঁধনত গুণী হন' সিজন ওয়ান। এরপর ২০২৩ সালে আয়োজন করা হয় 'হুনি রাঁধনত গুণী হন ' সিজন টু। যেখানে অংশগ্রহণ করেছেন দেশের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অসংখ্য রাঁধুনী।
'হুনি রাঁধনত গুণী হন' সিজন ওয়ান:
মোট তিন পর্বে অনুষ্ঠিত হয় 'হুনি রাঁধনত গুণী হন' সিজন ওয়ান। প্রথম পর্ব অনুষ্ঠিত হয় অনলাইনে। প্রথম পর্বে ১১৬ জন প্রতিযোগী অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করেন। প্রতিযোগীরা ছবি/ভিডিও সহ তাদের রেসিপি অনলাইনে জমা দেন। শুঁটকি দিয়ে তৈরি ট্রেডিশনাল রেসিপির পাশাপাশি ছিল প্রতিযোগীদের নিজস্ব বেশ কিছু ইউনিক রেসিপি। প্রথম পর্বের ১১৬ জন প্রতিযোগী থেকে বিচারকগন চুল ছেড়া বিশ্লেষণ করে ২১ জনকে দ্বিতীয় পর্বের জন্য নির্বাচিত করেন। প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বের প্রতিযোগীদের জন্য শুঁটকিজ এর পক্ষ থেকে উপহার হিসেবে পৌঁছে দেওয়া হয় প্রিমিয়াম কোয়ালিটির শুঁটকি।
১৮ ডিসেম্বর ২০২১ তারিখ চট্টগ্রামের উইন্ড অফ চেঞ্জ রেস্টুরেন্টের রূফ টপে ২য় পর্বের আয়োজন করা হয়। ২১ জন প্রতিযোগীরা বিচারকদের সামনে তাদের রান্না প্রদর্শন করেন। প্রতিযোগীরা ট্রেডিশনাল ও ইউনিক রেসিপি নিয়ে যান। যেগুলো দেখতে ও খেতে ছিল অসাধারণ। ইউনিক রেসিপি গুলো হল, শুঁটকির মোমো, শুঁটকির সুশি, শুঁটকির পিজ্জা, শুঁটকির মালাইকারি, শুঁটকির বার বি কিউ, শুঁটকির সিজলিং, শুঁটকির টফি, শুঁটকির আচার ও নাচোস সহ আরো অনেক রেসিপি। কঠিন বিচার কাজ শেষে ২১ জন প্রতিযোগী থেকে ৭ জন কে ফাইনালের জন্য নির্বাচিত করা হয়। সেই সাত ৭ জন প্রতিযোগী হলেন- কাউসারি সুলতানা, সাউদা ইয়াসমিন, জেসমিন আক্তার জেসি, সাথী সুজন, কোহিনুর জুলিয়া, নুসরাত জাহান মুনিয়া ও ফারজানা শরীফ।
এরপর ফাইনাল পর্ব অনুষ্ঠিত হয় ১৪ জানুয়ারি ২০২২ তারিখ চট্টগ্রামের বেস্ট ওয়েস্টার্ন এলায়েন্স হোটেলে। অনুষ্ঠানে বিচারক ছিলেন লিনাস রোজারিও, সাবিনা ইকরাম সিরাজী, রুবিনা রুবি, সায়মা সুলতানা, নুর আক্তার জাহান, কামরুন এন কে, ডা. উম্মে রুমানা, সঞ্জয় চৌধুরী। সাতজন প্রতিযোগী বিচারকদের উপস্থিতিতে দুটি করে রেসিপি রান্না করেন। বিচারকদের সরাসরি ভোটে কাউসারি সুলতানা চ্যাম্পিয়ন, সাথী সুজন প্রথম রানার্স আপ এবং জেসমিন আক্তার জেসি দ্বিতীয় রানার্স আপ হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রধান অতিথি হিসেবে চ্যাম্পিয়নের হাতে ট্রফি তুলে দেন সমাজসেবক ফরিদ মাহমুদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে প্রথম ও দ্বিতীয় রানার্স আপ এর হাতে পুরস্কার তুলে দেন ইন্ডিপ্যান্ডেন্ট এ্যাপারেলের এমডি সাবেক বিজিএমইএ নেতা মোহাম্মদ আবু তৈয়ব এবং র্যাঙ্কস প্রপার্টিজ সিইও তানভির শাহরিয়ার রিমন। অনুষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ছিলেন শুটকিজ এর ফাউন্ডার তৌহিদুল ইসলাম। উপস্থাপনা করেন আয়োজক কমিটির সদস্য সায়মা সুলতানা ও আরাফাতুল ইসলাম আকিব। জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় 'হুনি রাঁধনত গুণী হন ' সিজন ওয়ান।
'হুনি রাঁধনত গুণী হন' সিজন টু:
‘শুঁটকি রেঁধে লাখপতি’ এই স্লোগানকে সামনে রেখে আয়োজন করা হয় শুঁটকিজ আয়োজিত, এগ্ৰোহাট নিবেদিত 'হুনি রাঁধনত গুণী হন' সিজন-টু। মোট তিন পর্বে অনুষ্ঠিত হয় এই প্রতিযোগিতা। প্রতিযোগীতায় আয়োজক হিসেবে ছিলেন তৌহিদুল ইসলাম, সায়মা সুলতানা, মিজানুর রহমান, প্রলয় হাসান, প্রকৌশলী জসীম উদ্দিন, কাজী ইরফানুল মোস্তফা ও মোহাম্মদ জাহেদুল আলম। প্রতিযোগিতায় মেন্টর হিসেবে ছিলেন সিজন ওয়ানের সাত ফাইনালিস্ট- কাউসারি সুলতানা, সাউদা ইয়াসমিন, জেসমিন আক্তার জেসি, ফারজানা শরীফ, কোহিনূর জুলিয়া ও নুসরাত জাহান মুনিয়া। অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের মাধ্যমে চট্টগ্রাম ও ঢাকা বিভাগের মোট ৩০০ জন প্রতিযোগী নিয়ে ৮ মার্চ ২০২৩ তারিখ শুরু হয় প্রতিযোগিতার প্রথম পর্ব। প্রথম পর্বে প্রতিযোগীরা তাদের চমৎকার, ইউনিক রেসিপি ছবি/ভিডিও সহকারে অনলাইনে জমা দেন। রেসিপি গুলো ছিল, শুঁটকির কদম ফুল, পাতুরি, সুইচ রোল, শুঁটকির নারকেলি দুরুস, আচার, শুঁটকির সালাদ, শুঁটকির স্যান্ডউইচ কেক, কবিরাজি কাটলেট সহ আরো অনেক রেসিপি। অনলাইনে যাচাই বাছাই শেষে বিজ্ঞ বিচারকগণ চট্টগ্রাম জোন থেকে ২৫ জন ও ঢাকা জোন থেকে ২০ জন প্রতিযোগীকে সেমিফাইনালের জন্য নির্বাচিত করেন।
১৯ মে ২০২৩ তারিখ ঢাকা নিকুঞ্জ-২ হোটেল ফাউন্টেন অডিটোরিয়ামে ঢাকা জোনের সেমিফাইনাল অনুষ্ঠিত হয়। জমজমাট এই সেমিফাইনালে ঢাকা বিভাগের ২০ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগীরা তাদের চমৎকার রেসিপি সমূহ বিচারকদের সামনে প্রদর্শন করেন। আয়োজনে বিচারক হিসেবে ছিলেন শেফ শাহীন আফরোজ, শেফ মিলা মঞ্জুসা, শেফ হাসিনা আনছার, শেফ রুবিনা রুবি, শেফ নুর আক্তার জাহান ও শেফ নজরুল ইসলাম। বিজ্ঞ বিচারকগণ রেসিপির বিচার বিশ্লেষণ এবং বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে ৫ জন প্রতিযোগীকে ফাইনাল রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত প্রতিযোগীরা হলেন- সাবিরা নিলা, রুনি আহম্মেদ, মেরিনা সুলতানা, মোহাম্মদ ফয়সাল ও রুহুল আমিন বিশ্বাস।
২৬ মে ২০২৩ তারিখ চট্টগ্রাম নগরীর হোটেল পেনিন্সুলার ডালিয়া হলে অনুষ্ঠিত হয় চট্টগ্রাম জোনের সেমিফাইনাল অনুষ্ঠান। জমজমাট এই সেমিফাইনালে চট্টগ্রাম বিভাগের ২৫ জন প্রতিযোগী অংশগ্রহণ করেন। প্রতিযোগিরা শুঁটকির তৈরি চমৎকার ও ইউনিক রেসিপি সমূহ বিচারকদের সামনে প্রদর্শন করেন। আয়োজনে বিচারক হিসেবে ছিলেন, রন্ধনশিল্পী জোবাইদা আশরাফ, রন্ধনশিল্পী রওশন আকতার, রন্ধনশিল্পী নুর আকতার জাহান, রন্ধনশিল্পী সাবিনা ইকরাম সিরাজি ও শেফ ইরফান। বিজ্ঞ বিচারকগন রেসিপির বিচার বিশ্লেষণ করে এবং বিভিন্ন প্রশ্নের মাধ্যমে ৫ জনকে ফাইনাল রাউন্ডের জন্য নির্বাচিত করেন। নির্বাচিত প্রতিযোগীরা হলেন- তানভি ফাহিম, ফারাহ আকতার, ফাতেমা আক্তার, সায়মা সিদ্দিকা ও আফসারা সাদি। সেমিফাইনালে অংশগ্রহণকারী ঢাকা ও চট্টগ্রাম জোনের সকল প্রতিযোগীকে এগ্রোহাট, টপার কিচেন ওয়্যার ও ঘরোয়া পক্ষ থেকে উপহার সহ শুটকিজ থেকে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়।
২য় পর্ব শেষে ঢাকা জোন ও চট্টগ্রাম জোনের ১০ জন সেমিফাইনালিস্টদের নিয়ে ৯ জুন ২০২৩ তারিখ চট্টগ্রামের ওয়েল এগ্রো এন্ড ডেইরি ফার্মে আয়োজিত হয় জমজমাট গ্র্যান্ড ফিনালে। ইট পাথরের শহরে ওয়েল এগ্ৰো এন্ড ডেইরি ফার্ম যেন এক টুকরো প্রশান্তির জায়গা। প্রাকৃতিক মনোরম পরিবেশ সেই সাথে সেদিন ছিল বৃষ্টি। এমন বৃষ্টিস্নাত দিনে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের মাঝে রাঁধুনীরা রান্না করছিলেন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী শুঁটকি। প্রতিযোগী, বিচারক, আয়োজক ও অতিথিদের উপস্থিতিতে মুখরিত হয়েছিল সেদিনের পরিবেশ।
দশজন প্রতিযোগী বিচারকদের উপস্থিতিতে দুটি করে রেসিপি রান্না করেন। শুঁটকি রান্নার মৌ মৌ সুঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়েছিল চারদিকে। বিচারকদের সরাসরি ভোটে ফারাহ আক্তার চ্যাম্পিয়ন, রুনি আহম্মেদ প্রথম রানার্স আপ এবং তানবি ফাহিম দ্বিতীয় রানার্স আপ হিসেবে নির্বাচিত হন। প্রতিযোগীতা শেষে ১০ জন প্রতিযোগীর হাতে তুলে দেওয়া হয় ক্রেস্ট ও উপহার। সেই সাথে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয় ভিউয়ার্স চয়েস এওয়ার্ড উইনার তানভি ফাহিমের হাতে। সব শেষে ট্রফি ও প্রাইজমানি তুলে দেওয়া হয় চ্যাম্পিয়ন ফারাহ আক্তারের হাতে। শুটকিজ পেয় যায় লাখ টাকার রেসিপি, যে রেসিপি দিয়ে গুনী রাঁধুনী ফারাহ আক্তার জিতে নেন লাখ টাকা পুরস্কার।
রান্না প্রতিযোগিতা তো আমরা অনেক দেখলাম। কিন্তু শুঁটকি রেঁধে লাখপতি কিংবা শুঁটকি রান্নার এমন উৎসব, আয়োজন আগে কখনো কি হয়েছে? বাংলাদেশের এক একটি জেলা বিভিন্ন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্য, স্থান, পুরাকীর্তি, ফল-ফলাদি প্রভৃতি খাদ্য সামগ্রীর জন্য বিখ্যাত। তেমনি চট্টগ্রাম বিখ্যাত মেজবান ও শুঁটকির জন্য। বহুকাল আগে যখন মাছ সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা ছিল না তখন জেলে পরিবার গুলো মাছ কে শুকিয়ে তৈরি করতেন শুঁটকি। আর সেই সব শুঁটকি সারা বছর সংরক্ষণ করতেন খাওয়ার জন্য। এক সময় শুধু জেলে পরিবার গুলো নিজেরা খাওয়ার জন্য অল্প পরিমাণে শুঁটকি শুকালে ও ধীরে ধীরে এই শুঁটকি জায়গা করে নিয়েছে গোটা দেশ ও দেশের বাইরে। খাবার টেবিলে আট দশ পদের খাবার থাকলে ও সবার নজর থাকে শুঁটকির তৈরি রেসিপির দিকে। যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী এই শুঁটকি চট্টগ্রামের ঐতিহ্য কে বহন করে যাক, যেভাবে অতীতে ও করে গেছে। বাঙ্গালীর পাতে পাতে থাক এই শুঁটকি যেভাবে বাঙ্গালীর পাতে রুপালি ইলিশ ও জায়গা করে নিয়েছে। ছোট শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সবাই পাক ভেজালমুক্ত পুষ্টি গুণে ভরপুর শুঁটকির স্বাদ।